
বিষয়: হাদীস অস্বীকারের ভ্রান্তি: কুরআনিক প্রমাণ, প্রসঙ্গ ও যৌক্তিক বিশ্লেষণ।
জাহাঙ্গীর ভাই একটি গ্রুপে এই পোষ্টটি করেছেন: সালামুন আলাইকুম। তোমার প্রতি যা ওহি কর হয় তুমি শুধু তাঁহারই অনুসরণ করো” (আল কোরআন)। “আমার প্রতি যাহা ওহি করা হয় আমি শুধু তাহারই অনুসরণ করি” (আল কোরআন)। কোরআনুল কারিম এর বাইরে কোন ওহির কিতাব নাই। ওহিয়ে গায়ের মাতলু মানুষের বানানো কনসেপ্ট”। “আমি এই কিতাবে কোন কিছুই লিপিবদ্ধ করতে ছাড়ি নাই” (আল কোরআন)। “তোমরা এই হাদিস ব্যতিত আর কোন হাদিসে ঈমান আনয়ন করতে চাও”। কোরআনই হাদিস, হাদিসই কোরআন (আহসানাল হাদিস)।_
প্রিয় জাহাঙ্গীর ভাই: ওয়া আলাইকুম সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ! এইগুলো কুরআনের আয়াত,কথা-বাণী, কিন্তু আপনি কোন সূরার নাম এবং আয়াত নম্বর দেন নি? আয়াতগুলো শুনলে ভারী, কঠিন ও জটিল মনে হয়, কিন্তু প্রকৃত অর্থে এগুলো আয়াতের প্রসঙ্গবিচ্ছিন্ন উদ্ধৃতি এবং কুরআনের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ভিন্নভাবে দেখার ফল। নিচে প্রামাণ্য ও যুক্তিভিত্তিক আলোচনা করা হলো:
*১.আমি তো শুধু ওহির অনুসরণ করি (৪৬:৯) এ আয়াত নবী মুহাম্মদ (ﷺ) সম্পর্কে, উম্মত সম্পর্কে নয়:*
যে আয়াতগুলো উদ্ধৃত করা হয়েছে,আমি শুধু আমার প্রতি যা ওহি করা হয় তারই অনুসরণ করি (৪৬:৯, এটি নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)–এর কথা, কুরআনের আয়াত হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়েছে।
এর অর্থ: নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) ইসলাম দ্বীনে কোনো কিছু নিজের পক্ষ থেকে বলেননি। তিনি শুধু আল্লাহর নির্দেশই জনগণকে শিখিয়েছেন। উম্মতের ওপর নির্দেশ ভিন্ন। কুরআন আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছে: “রাসূল যা দেন তা গ্রহণ করো, যা নিষেধ করেন তা বর্জন করো।” (সূরা হাশর, ৫৯:৭)! এ আয়াত একাই হাদীস অস্বীকারকারীদের অবস্থানকে ভেঙে দেয়।
*২কুরআন ছাড়া আর কোনো ওহির কিতাব নাই”, এ দাবীই ভুল:
নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)–এর কাছে দুই ধরনের ওহি এসেছে:
_(ক). ওহি-মাতলু:_ ওহি-তিলাওয়াত যোগ্য, অর্থাৎ, পাঠযোগ্য ওহি, যা কুরআন। এর শব্দ ও অর্থ দুটিই আল্লাহ থেকে।
_(খ). ওহি-গাইর-মাতলু (অপাঠ্য ওহি):_ যার অর্থ আল্লাহ থেকে, কিন্তু শব্দ নবীর নিজের বর্ণনায়। এটাই হাদীস/সুন্নাহ। এ ধারণা “মানুযের বানানো কনসেপ্ট” নয়। এর Evidence কুরআনেই আছে:নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দিই।” (২:১২৯, ২:১৫১, ৩:১৬৪, ৬২:২)
হিকমাহ কিন্তু কুরআন নয়; তাহলে হিকমাহ কী? নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর ব্যাখ্যা, সুন্নাহ, হাদীস। এটি ওহি না হলে “কিতাব–হিকমাহ” দ্বৈত শিক্ষা দেওয়ার যৌক্তিকতা কোথায়?
*৩. “আমি এই কিতাবে কিছুই বাদ দেইনি (৬:৩৮)”*
তার মানে কুরআনে সবকিছু বিস্তারিতভাবে লেখা আছে, এমন নয়! আয়াতটির অর্থ: কুরআনে পথনির্দেশের সকল মূলনীতি বিবৃত। সবিস্তারে বা ডিটেইল নয়।
কেন? কারণ, যদি কুরআনেই সব বিস্তারিত থাকত, কিভাবে সালাত পড়বো? কিভাবে রোযা রাখবো?যাকাত কত শতাংশ? হজ্জের কত রুকন বিবাহ–তালাক, ফরায়েজের বিস্তারিত আইন? যুদ্ধবিধান, বিচারব্যবস্থা, শাসনব্যবস্থা, ব্যবসা-বানিজ্য? এসব কোথায়?
উত্তর: সুন্নাহতে। নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) বলেছেন: “আমাকে কুরআন দেওয়া হয়েছে এবং এর সঙ্গে আরেকটি অনুরূপ জ্ঞান দেওয়া হয়েছে”। (তিরমিজি)
*৪. “এই হাদীস ব্যতীত আর কোন হাদীসে বিশ্বাস করবে (৭৭:৫০)?”*
এখানে “হাদীস” শব্দের অর্থ = কুরআন। কুরআনে হাদীস শব্দটি দুই অর্থে এসেছে: (ক). আল্লাহর কথা/কুরআনের বার্তা। এগুলো যেমন: “আহসানুল হাদীস (৩৯:২৩)”। তেমনি:
_(খ). মানুষের কথা/গল্প/বর্ণনা:_ কুরআনেও মানুষের কথা/গল্প/বর্ণনাকে হাদীস বলা হয়েছে। যখন বলা হয়: “কুরআনের পর আর কোন হাদীসে বিশ্বাস করবে” (৭৭:৫০)? তার মানে: কুরআনের পর আর কোন মিথ্যা গল্প (৩১:৬), কুফরি বাণী, শয়তানের কাহিনি, কবির রচনা, এগুলো মানবে না।
হাদীস (প্রবক্তার বাণী) অস্বীকার করতে বলা হয়নি। বরং কুরআনই বলে: “রাসূলের আনুগত্য করো; যে রাসূলের আনুগত্য করলো সে আল্লাহর আনুগত্য করলো।”(৪:৮০)!
*৫. কুরআন হাদীসকে নিজেই আবশ্যক করেছে:* কুরআন বলে, নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) ব্যাখ্যা করবেন। “যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, তুমি তা মানুষকে ব্যাখ্যা করে দাও।” (১৬:৪৪)! যদি হাদীস না থাকে, তবে কুরআনের ব্যাখ্যা কোথায়?
কুরআন বলে, নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন করেন; “তিনি তাদের জন্য হালাল করেন যা ভালো এবং হারাম করেন যা খারাপ”।(৭:১৫৭)।হালাল–হারাম নির্ধারণের ক্ষমতা নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে দেওয়া হয়েছে, এটাই সুন্নাহ।
কুরআন বলে, নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) বিচারক (৪:৬৫) I নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর বিচার-বিধান, এগুলোই সুন্নাহ।
কুরআন বলে, নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর অনুসরণ করতেই হবে (৩৩:২১)। নবী কিভাবে জীবনযাপন করেছেন, এটাই হাদীস, এইটি সুন্নাহ।
*৬. প্রসঙ্গবিহীন আয়াত ব্যবহার করার প্রবণতা:*
তাদের ভুলগুলো এভাবে: (ক). আয়াতকে প্রসঙ্গ ছাড়া টেনে আনা; (খ). ব্যাখ্যাকারী হিসেবে নবীর ভূমিকা মুছে দেওয়া; (গ). হাদীস শব্দের কুরআনিক অর্থ না বোঝা; (ঘ). কুরআনের সমগ্র আইনগত কাঠামো উপেক্ষা করা।
এগুলো পুরোপুরি “Cherry Picking”—যা একাডেমিকভাবে ভুল।
*৭. কুরআন কোনদিন হাদীসকে অস্বীকার করতে বলেনি, বরং প্রতিষ্ঠা করেছে:*
তাদের বক্তব্যের সারমর্ম দাঁড়ায়: “আমরা নবীকে মানি, কিন্তু নবী কী বলেছেন তা মানি না।” এটি স্ববিরোধী। কারণ, নবীর “উক্তি–কর্ম–অনুমোদন” ছাড়া ইসলাম বাস্তব হয় না।
*চূড়ান্ত মন্তব্য (সারমর্ম):*
_(ক). বিষয়গুলো পুর্নমূল্যায়ন করা প্রয়োজন:_ যারা কুরআনকে ব্যাখ্যাহীন, প্রেক্ষাপটহীন, ও নবীর ভূমিকা-বিহীন করে দেখতে চায়; তাদের এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
_(খ). কুরআনের দাবিই হলো:_ নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) ব্যাখ্যা করবেন; নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) বাস্তবায়ন করবেন; নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর অনুসরণ করতে হবে; নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর সিদ্ধান্ত আইন।
হিকমাহ = সুন্নাহ; কুরআন + সুন্নাহ = ইসলামের সম্পূর্ণ রূপরেখা; কুরআনকে মানতে হলে, সুন্নাহকে মানতেই হবে। সুন্নাহ অস্বীকার করা মানে, কুরআনের বহু আয়াত অস্বীকার করা।
*আল্লাহ-হুম্মা সাল্লি, ওয়া সাল্লিম, ওয়া বারিক আ’লা মুহাম্মাদ; আল-হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামীন*। (মূসা: ১০-১২-২৫)