
রানা,যশোর প্রতিনিধি:
দীর্ঘ ১৬ বছর পর পুনরায় চালু হওয়া জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা গ্রামীণ মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য আশার আলো হয়ে এসেছিল। কিন্তু যশোরের মনিরামপুর উপজেলার মনোহরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রশাসনিক গাফিলতি ও দায়িত্বহীনতার কারণে সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়েছে ৮ জন শিক্ষার্থীর।
অনলাইন নিবন্ধনে গাফিলতি,সুযোগ হারাল শিক্ষার্থীরা
বিদ্যালয় ও অভিভাবক সূত্রে জানা যায়,পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত ফি ও সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনলাইন নিবন্ধন ও কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়নি। অনলাইন কার্যক্রমের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। ফলে শিক্ষা বোর্ড ওই শিক্ষার্থীদের আবেদন গ্রহণ করেনি এবং তারা বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।
অভিভাবকদের অভিযোগ,কোনো তথ্য জানানো হয়নি
অভিভাবকরা জানান,অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়ার বিষয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো অগ্রগতি বা সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি। বিদ্যালয়ের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখেই তারা অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অবহেলার মাশুল দিতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের।
আগেও ঘটেছে একই ধরনের অনিয়ম
অভিভাবকদের দাবি,মনোহরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এটি প্রথম ঘটনা নয়। এর আগেও এসএসসি অনলাইন ফরম পূরণের সময় নামের বানান ভুলসহ নানা ত্রুটি দেখা দিয়েছিল। তখনও সংশোধনের জন্য শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অতিরিক্ত অর্থ ও ভোগান্তির শিকার হতে হয়। কিন্তু দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় এবার আরও বড় ক্ষতি হয়েছে।
মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে শিক্ষার্থীরা
বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য ৮ শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুতি নিয়েছিল। কেউ কোচিং করেছে,কেউ অতিরিক্ত পড়াশোনা করেছে। হঠাৎ করে পরীক্ষার সুযোগ হারিয়ে তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। কয়েকজন শিক্ষার্থী পড়াশোনার আগ্রহও হারিয়েছে বলে জানিয়েছেন অভিভাবকরা।
প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইউনুস আলী মোল্লা জানান, অনলাইন কার্যক্রমের দায়িত্ব ছিল অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর তোজাম্মুল হোসেনের ওপর। তার গাফিলতির কারণে সময়মতো আবেদন সম্পন্ন হয়নি। এ ঘটনায় বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে এবং পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা শিক্ষার্থীদের জন্য সাধারণ গ্রেডের বৃত্তির টাকা বহনের মুচলেকা নেওয়া হয়েছে।
অভিভাবকদের প্রশ্ন: শুধু একজনকে দায়ী করলেই কি দায় শেষ?
তবে অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, এটি কোনো একক ব্যক্তির ব্যর্থতা নয়। প্রধান শিক্ষকের সার্বিক তদারকি ও প্রশাসনিক দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া যায় না। অনলাইন কার্যক্রমে একাধিক স্তরের যাচাই থাকা জরুরি ছিল।
ইউএনওর আশ্বাস: তদন্ত চলছে
ঘটনাটি জানাজানি হলে উপজেলা প্রশাসন তদন্ত শুরু করে। মনিরামপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সম্রাট হোসেন বলেন,বিষয়টি তদন্তাধীন। যদি কারো গাফিলতির কারণে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি হয়ে থাকে,তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতামত
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা বলছেন,এই ঘটনা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় জবাবদিহিতার ঘাটতি ও প্রশাসনিক দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি। অনলাইন কার্যক্রমে দক্ষ জনবল,সময়সীমা মনিটরিং ও স্বচ্ছ যোগাযোগ না থাকলে ভবিষ্যতেও এমন ঘটনা ঘটবে।
এলাকাবাসীর দাবি,দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও কাঠামোগত সংস্কার
এলাকাবাসী ও অভিভাবকরা চান—
দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা
অনলাইন কার্যক্রমে একাধিক দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি
নির্ধারিত সময়ের আগে অভিভাবকদের অবহিতকরণ
শিক্ষা প্রশাসনের কঠোর নজরদারি
প্রতীকী অর্থে বড় ক্ষতি
ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মাত্র ৮ জন শিক্ষার্থী, কিন্তু এই ঘটনা পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। সামান্য অবহেলাই যে শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ নষ্ট করতে পারে—মনোহরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ঘটনা তার জ্বলন্ত উদাহরণ।
এখন দেখার বিষয়,তদন্ত শেষে দোষীদের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং ভবিষ্যতে এমন অবহেলা রোধে প্রশাসন কতটা দৃঢ় ভূমিকা রাখে।