
।।জেমস আব্দুর রহিম রানা ।।
এই সময়ের দুনিয়ায় শব্দ এখন দ্রুতগতির—ছোট, ঝাঁঝালো, ক্ষণিকের। অথচ ঠিক এই ভিড়ের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন কবি সানজিদা বিনা। তিনি তাড়াহুড়োর মানুষ নন। তিনি থামেন, শোনেন, দেখেন—তারপর লেখেন।তার কাছে শব্দ কোনো প্রদর্শনী নয়,শব্দই তার শ্বাস-প্রশ্বাস,তার আত্মরক্ষা,তার নীরব প্রতিবাদ।
কেউ তাকে ডাকেন‘শব্দের শ্রমিক’কেউ,স্বপ্নে হাঁটা নারী’আবার কেউ তাচ্ছিল্য করে বলেন—‘পাগল লেখিকা’। কিন্তু এসব নামের বাইরে তিনি একজন নির্ভীক স্রষ্টা—যিনি কারও স্বীকৃতির অপেক্ষা না করে নিজের সত্যকে লিখে যান।
শোনা যায়, এক বিষণ্ণ আকাশের নিচে তার জন্ম। গল্পটা লোককথা হলেও তার লেখার ভেতরে যে দীর্ঘশ্বাসের আবহ, মানবিক যন্ত্রণা আর গভীর উপলব্ধি—তা যেন সেই মেঘলা দিনেরই স্থায়ী ছায়া। শৈশব থেকেই তিনি আলাদা ছিলেন। কথা কম, চোখ বেশি। খেলনার চেয়ে খাতার সাদা পাতা, জানালার ফাঁকে লুকিয়ে থাকা আকাশ কিংবা ঝরা পাতার শব্দ তার কাছে ছিল বেশি আকর্ষণীয়।
পুতুল খেলার বয়সেই তার ভেতরে জন্ম নেয় গল্প। সেগুলো তখন কাগজে লেখা হয়নি,কিন্তু হৃদয়ে জমেছিল। সময়ের সঙ্গে সেই কল্পনা শব্দে রূপ নেয়—আর শব্দই হয়ে ওঠে তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয়। একসময় তিনি বুঝে ফেলেন—লেখা তার অভ্যাস নয়,তার নিয়তি।
সানজিদা বিনার লেখার প্রক্রিয়া সাধারণ নয়। তিনি যখন লিখতে বসেন, বাস্তব জগৎ তখন দূরে সরে যায়। গভীর রাতে আলো-আঁধারিতে চরিত্রদের সঙ্গে নীরব সংলাপ,একটি পঙক্তির জন্য দীর্ঘক্ষণ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা,কিংবা নিজেকে ইচ্ছাকৃত নিঃসঙ্গ করে রাখা—এসবই তার সৃষ্টির নিয়ম। বাইরে থেকে অদ্ভুত মনে হলেও তার কাছে এগুলো জরুরি। তার কথায়,লেখা মানে নিজের ভেতরের আগুনকে শব্দে রূপ দেওয়া।
তার কবিতায় প্রেম চিৎকার করে আসে না। সেখানে প্রেম ক্লান্ত,কখনো আহত,কখনো অসমাপ্ত। বিচ্ছেদ সেখানে হাহাকার নয়—বরং দীর্ঘ,চাপা এক নিঃশ্বাস। তার কবিতা পাঠকের মনে ঢুকে পড়ে নিঃশব্দে, কিন্তু থেকে যায় বহুদিন। অনেকেই বলেন—তার পঙক্তিতে তারা নিজের জীবনকে আবিষ্কার করেন।
ছোটগল্পে তিনি আরও নির্মমভাবে বাস্তব। তার গল্পে কোনো অতিমানব নেই,নেই রূপকথার সুখী সমাপ্তি। আছে ফুটপাতে ঘুমানো শিশু,একাকী বৃদ্ধা,নীরবে সহ্য করা নারী,আর জীবনের ভারে নুয়ে পড়া পুরুষ। তিনি তাদের কথা বলেন কঠোর সততায়,কিন্তু গভীর মমতায়।
উপন্যাসে এসে তার কলম আরও বিস্তৃত হয়—আরও মনস্তাত্ত্বিক। মানুষের ভেতরের দ্বন্দ্ব,অপরাধবোধ,না-পারার ব্যথা, কিংবা চাপা অন্ধকার তিনি তুলে আনেন নিপুণভাবে। তার উপন্যাস পড়া মানে শুধু গল্প পড়া নয়—নিজের ভেতরের গোপন করিডোরে হেঁটে যাওয়া।
ব্যক্তিজীবনে তিনি নিঃসঙ্গ—কিন্তু এই নিঃসঙ্গতা তার শক্তি। বই, কালি আর কাগজে ভরা তার ঘরটি যেন এক জীবন্ত সাহিত্যভূমি। জানালার পাশে রাখা পুরনো টেবিলটাই তার সাধনার আসন। তিনি বিশ্বাস করেন—গভীর লেখা ভিড় থেকে জন্মায় না,একা হতে জানতে হয়।
খ্যাতি বা পুরস্কার তাকে টানে না। বড় প্রকাশনীর আগ্রহ থাকলেও মনের সঙ্গে না মিললে তিনি লেখা প্রকাশ করেন না। তার কাছে লেখা পেশা নয়—এটি বেঁচে থাকার অক্সিজেন। তিনি বলেন,
যেদিন কলম থামবে,সেদিনই আমার জীবন থেমে যাবে।”
সময় যত গড়িয়েছে, তার লেখার গভীরতা তত বেড়েছে। হয়তো তিনি প্রচারের আলোয় নন, কিন্তু যারা তাকে পড়েন—তাদের কাছে তিনি ভীষণ আপন। কারণ তার লেখায় কোনো মুখোশ নেই—আছে সাহস,সততা আর খাঁটি মানবিকতা।
সানজিদা বিনার জীবন কোনো সাধারণ জীবনী নয়। এটি এক নীরব বিদ্রোহের গল্প, এক সৃষ্টিশীল উন্মাদনার গল্প,আর শব্দের প্রতি আজীবন ভালোবাসার দলিল। তিনি‘পাগল লেখিকা’
হয়েই থাকতে চান—কারণ এই পাগলামির মাঝেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন নিজের অর্থ।
শরীর একদিন থেমে যাবে—তিনি জানেন।
কিন্তু তার বিশ্বাস,
তার শব্দ—
তার কবিতা ও গল্প—
মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে বহু দূর, বহু কাল।
কবি সানজিদা বিনা—
যিনি শব্দে বুনে দেন স্বপ্ন,
আর নীরবতায় গড়ে তোলেন
এক মানবিক পৃথিবী।