
আশ্বিন পেরিয়ে কার্তিক মাসে শীতের অনুভব হতে না হতেই প্রতি বছরের মত এবারও চারঘাট উপজেলার বিভিন্ন গ্রামগঞ্জে খেজুর গাছের মালিকদের সাথে চুক্তি করে আগে ভাগেই শুরু করেছে খেজুর গাছ পরিচর্যার (তোলা ও ঝোড়া) কাজ। এখন খেজুর গাছ পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। আগামী ৪ মাস একনাগারে চলবে এ কর্মযোগ্য। এনিয়ে খেজুর গাছিদের মধ্যে চলছে মনোপ্রতিযাগিতা।
রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, পতিত জমি, ভিটা, জমির আইল,রাস্তার দুই ধারসহ বিভিন্ন জায়গায় খেজুর গাছ রয়েছে।
এসব খেজুর গাছ রোপণ না করলেও এমনিতেই হয়েছে। একসময় এই উপজেলায় প্রচুর খেজুর গাছ ছিল। খেজুর গাছ দিয়ে কোনো আসবাবপত্র তৈরি না হওয়ায় অনেক গাছ কেটে ইটের ভাটায় জ্বালানির কাজে ব্যবহার করা হয়।
তার পরও গ্রামাঞ্চলে এখনো প্রচুর খেজুর গাছ রয়েছে। উপজেলার পল্লী গ্রামের মাটির ঘরে তীর হিসেবে খেজুর গাছ আজও ব্যবহার করছে অনেকে।
শীত মৌসুমে খেজুর রস আহরন হয়। আর এই আশায় গাছিরা রস সংগ্রহের অপেক্ষায় থাকে। অগ্রহায়ণ মাসে নতুন ধান ওঠে প্রতিটি ঘরে।
নতুন ধানের চালের গুঁড়া দিয়ে খেজুর রস ও গুড় দিয়ে পিঠা তৈরীর ধুম পড়ে গ্রামগঞ্জে। শীত মৌসুমে গাছিরা খেজুর রস সংগ্রহ করে বড় পাত্রে ঢেলে আগুনে জাল দিয়ে লালি, দানাদার ও পাটারী গুড় তৈরি করেন।
এ ছাড়া শীতে প্রতিটি ঘরে নতুন চালের আটা আর খেজুর গুড়ের পিঠা-সাপটার খাওয়ার ধুম পড়ে। আর শুরু হয় শীতের পিঠা তৈরী করে মেহমান আপ্যায়ন।
উপজেলার ঝিকরা গ্রামের লেপতার আলী বলেন, ৪৫টি বছর ধরে খেজুরের গাছ কেটে অন্তত ৬ মাস সংসার চালায়। এ বছরও ১২০ বেশি খেজুরের গাছ তোলার (পরিচর্যার) কাজ শুরু করেছি।
সকাল থেকে সন্ধ্যা অব্দি ছুটে চলেছেন এ গাছ থেকে অন্য গাছ কাটায়। নিয়মিতভাবে খেজুরের গাছের সংখ্যা কমলেও গ্রামের একমাত্র গাছি তিনি।
বয়সের ভারে গাছে উঠতে কষ্ট হলেও এই রস ও গুড় বিক্রি করে আগামী ৬ মাস চলতে পারবেন। এই আশায় পরিশ্রম করছেন তিনি।
আরো বলেন, ১০ ঠিলে (কলস) রস থেকে এক ঠিলে গুড় হয়। একটি গাছ থেকে এক সিজনে প্রায় ১২০-১৪০ ঠিলে রস আহরণ সম্ভব।
ভোরে যেমন রসের কদর আছে ঠিক তেমনি গুড়ের কদরও কম না। এক ঠিলে রস ১২০ টাকা করে বিক্রি হয়।
অন্যদিকে এক কেজি নলেন গুড়ের দাম প্রায় ১৮০-২০০ টাকা। বর্তমানে এক ঠিলে গুড় বিক্রি হয় হাজার থেকে ১২শ টাকায়। শীতের সময়ে গুড় ও রস বিক্রি করে সংসারটা ভালোই চলে।
তার মতোই গ্রামে গ্রামে চলছে গাছ কাটা বা গাছ তোলার ধুম। দা ধার দেওয়া, ঠিলে ও নলি তৈরি করা আরো কতো কী। হবে না কেন? আগামী চার মাস যে এ গাছগুলোই তাদের রুজি-রুটি
তারা আরো জানান, অগ্রহায়ণ থেকে মাঘ এই তিন মাস খেজুর রস সংগ্রহ করা হয়। সপ্তাহের দুই থেকে তিন দিন রস সংগ্রহ বন্ধ রাখা হয়।
এর ফলে গাছের রস ভালো হয়। গাছের মালিকদের তিন মাসে দশ কেজি করে গুড় দিতে হয়। রস থেকে তৈরি গুড় গাছিরা বাজারে বিক্রি করেন।
গাছিরা তিন মাসে একটি গাছের রসের গুড় বিক্রি করে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা আয় করেন।
গ্রাম বাংলার সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক এ খাতে সরকারি কোনো পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় বর্তমানে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে এ পেশা। আবার এ কাজে কঠোর পরিশ্রম হওয়ায় বর্তমান যুব কৃষকরা আগ্রহ হারাচ্ছে।
ইট ভাটার জ্বালানির জন্য হাজার হাজার গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে, যার কারণে আগামীতে খেজুর গুড় ও রস বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও মনে করেন সচেতন নাগরিকরা।