
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
বকেয়া বেতন,বছরের পর বছর জমে থাকা ওভারটাইমের টাকা এবং নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন সুবিধা না পাওয়ার অভিযোগে চট্টগ্রামে আজিম গ্রুপের একাধিক অঙ্গ প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের ক্ষোভ অবশেষে বিস্ফোরিত হয়েছে। শনিবার (২ মে) নগরের চান্দগাঁও থানাধীন সিএন্ডবি চত্বরে কয়েক হাজার শ্রমিক সড়ক অবরোধ করলে পুরো এলাকায় সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট, ভোগান্তিতে পড়ে হাজারো মানুষ।
সকাল ১১টার দিকে শুরু হওয়া এই অবরোধ দ্রুতই আশপাশের প্রধান সড়কগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় ৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। জরুরি কাজে বের হওয়া মানুষ আটকে পড়েন ঘণ্টার পর ঘণ্টা, অনেকে বাধ্য হয়ে হেঁটে গন্তব্যে রওনা দেন। অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত দীর্ঘ সময় স্থবির হয়ে পড়ে,যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে।
শ্রমিকদের অভিযোগ,দীর্ঘদিন ধরে তাদের ন্যায্য পাওনা আটকে রাখা হয়েছে। ২০২০ সাল থেকে টিফিন বিল,২০২২ ও ২০২৫ সালের ওভারটাইমের টাকা এবং সাম্প্রতিক মাসগুলোর বেতন পরিশোধ করা হয়নি। নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন সুবিধা নিয়েও রয়েছে ব্যাপক অনিয়ম।
এক নারী শ্রমিক রেশমি জানান,২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে কাজ করেও এখনো বেতন পাইনি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চের বেতন পুরো পাওয়ার কথা থাকলেও এক মাসেরটাও ঠিকমতো দেয়নি।
অন্য শ্রমিক আকলিমা খাতুন বলেন,মাতৃত্বকালীন বিল বছরের পর বছর বকেয়া। শুধু আশ্বাস,কিন্তু বাস্তবে কিছুই নেই।
আরেক শ্রমিক হাসান শরিফ গুরুতর অভিযোগ তুলে বলেন, ২০২২ সালের ওভারটাইমের প্রায় ৪৫ হাজার টাকা সিগনেচার জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে। আমাদের নাম পর্যন্ত খাতায় নেই। পাঁচ বছর ধরে নাস্তার বিলও দেয়নি।
শ্রমিকদের ৮ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—বকেয়া বেতন ও ওভারটাইম দ্রুত পরিশোধ,ওভারডিউটি কমানো,প্রতি মাসের শুরুতেই বেতন প্রদান,শ্রমিকবান্ধব ইউনিয়ন গঠন, আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের হয়রানি বন্ধ, টিফিন বিল বৃদ্ধি এবং হাজিরা বোনাস চালু।
এদিকে অবরোধের কারণে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়। এক যাত্রী জানান,জরুরি কাজে বের হয়ে কয়েক ঘণ্টা আটকে ছিলাম,শেষ পর্যন্ত হেঁটে যেতে হয়েছে।অ্যাম্বুলেন্স চালক আরিফুল ইসলাম বলেন,রোগী নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে,এটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।
ঘটনার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মকর্তাকে ঘটনাস্থলে দেখা যায়নি,যা শ্রমিকদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ ও শিল্প পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে মোতায়েন রয়েছেন।
চান্দগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নুর হোসেন মামুন জানান, শ্রমিকদের অবরোধের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাজ করছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশের সুপার আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন,বেতনসংক্রান্ত জটিলতার কারণেই এই পরিস্থিতি। মালিক ও শ্রমিক—উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে।
শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা এবং বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগই এ বিস্ফোরণের মূল কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দ্রুত কার্যকর সমাধান না এলে এমন আন্দোলন আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে, যা শিল্পাঞ্চল ও নগরজীবনে বড় ধরনের অচলাবস্থা সৃষ্টি করবে।