সম্পাদকীয়
বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে উত্তেজনা, সহিংসতা ও পারস্পরিক অবিশ্বাস রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশজুড়ে সৃষ্টি হওয়া অনিশ্চয়তা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা মানুষের মনে তীব্র উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রতিদিন নতুন লাশ, নতুন অস্থিরতা এবং নতুন উত্তেজনা দেশের সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বাজারে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, খুন-দখলবাজি, চাঁদাবাজির মতো অপরাধের বিস্তার ও রাজনৈতিক সংঘাত মিলিয়ে বাংলাদেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি আজ উদ্বেগজনক পর্যায়ে। রাজনৈতিক দলগুলোও নিজেদের অবস্থান নিয়ে বিভ্রান্ত ও অনৈক্যপূর্ণ। স্বাধীনতা বিরোধীদের নির্বাচন অংশগ্রহণ নিয়ে বিতর্ক, বিভিন্ন দলকে নিষিদ্ধ করার প্রশ্ন কিংবা সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা—সব ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে গভীর মতভেদ।
এ অবস্থায় গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একই দিনে আয়োজনের ঘোষণা রাজনৈতিক টানাপোড়েন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অনেক দল আশঙ্কা প্রকাশ করছে—ফলাফল নিজেদের মতো না হলে ‘অসুষ্ঠ নির্বাচন’ বলে অভিযোগ উত্থাপন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠবে। বিএনপি-সমমনা জোট এবং জামায়াতের আট দলীয় জোট একদিকে, অপরদিকে পুনরায় সক্রিয় হতে শুরু করা অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো—এই দুই মেরুর বিরোধই আজ দেশের রাজনীতি অচলাবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের পরামর্শকদের রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ এবং বিরোধী দলের আন্দোলনের সহিংস রূপ নেওয়ায় মধ্যবিত্ত থেকে সাধারণ জনগণ পর্যন্ত সবাই আজ নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঘোষিত লকডাউন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সারা দেশে আগুন, নাশকতা, ভাঙচুর, বাসে অগ্নিসংযোগ ও রেললাইন পোড়ানোর মতো ঘটনা জনমনে আরও আতঙ্ক তৈরি করেছে। এসব ঘটনায় হতাহত ও মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
আগামী ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রশ্ন উঠছে—সরকার কি এই সহিংস পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করে একটি শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে পারবে? নির্বাচনের আগে থেকেই দেশে যদি সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে ভোটের দিন পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা থেকেই যায়। নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে সব দলের অংশগ্রহণ ও জনগণের আস্থার ওপর, আর বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণ সেই আস্থাকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহুবার প্রমাণ হয়েছে—সহিংসতা কোনো সমস্যার সমাধান আনে না; বরং সমস্যা আরও গভীর করে। তাই আজ জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি করা। সংঘাত নয়, সংলাপই হতে পারে অচলাবস্থা কাটানোর একমাত্র পথ। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে দলগুলোর উচিত অভিযোগ-প্রতিনিধান, প্রতিশোধ ও ক্ষমতার রাজনীতি বাদ দিয়ে আলোচনায় বসা। একটি গ্রহণযোগ্য ও সম্মিলিত রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া আগামী দিনের বাংলাদেশ স্থিতিশীল হবে না।
বাংলাদেশের মানুষ শান্তি চায়, নিরাপত্তা চায়, স্থিতিশীলতা চায়। রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে তাই আহ্বান—সংলাপের পথেই ফিরে আসুন। সহিংসতার রাজনীতি দেশকে শুধু অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকেই ঠেলে দেয়।
এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো—সমঝোতা, আস্থার পুনর্গঠন এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে ফিরে আসা।
আওরঙ্গজেব কামাল।
লেখক ও গবেষক
সভাপতি,আন্তর্জাতিক প্রেস ক্লাব
ঢাকা প্রেস ক্লাব।