নিজস্ব প্রতিবেদক:
ব্যবসা শুরুর মাত্র ১৩ মাসের মধ্যে ৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা প্রিমিয়াম আয় করলেও ২১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয় করেছে শান্তা লাইফ ইন্স্যুরেন্স। প্রিমিয়াম আয়ের তুলনায় এ ব্যয় ৩১১ শতাংশ, যা অনুমোদিত সীমার চেয়ে প্রায় ১ হাজার ৩৯৬ শতাংশ বেশি বলে জানা গেছে। ফলে কোম্পানিটির লাইফ ফান্ডে ১৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন উৎস থেকে আরও ১৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা ঋণ নেওয়ায় গ্রাহকের বীমা দাবি পরিশোধে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কোম্পানিটির ত্রৈমাসিক ও বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রিমিয়াম আয়ের তুলনায় পরিচালন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেশি। পাশাপাশি কমিশন ব্যয়ে নিয়ম লঙ্ঘন এবং আর্থিক প্রতিবেদনে তথ্যের অসঙ্গতির অভিযোগও রয়েছে।
শান্তা লাইফ ইন্স্যুরেন্স ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবসা শুরু করে। প্রথম মাসে ৪৪ লাখ টাকা প্রিমিয়াম আয় করলেও পরিচালন ব্যয় হয় ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা। পরবর্তী বছর ২০২৫ সালে ৬ কোটি ৪৩ লাখ টাকা প্রিমিয়াম সংগ্রহ করতে ব্যয় করা হয় আরও ১৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
সব মিলিয়ে প্রথম ১৩ মাসে মোট ৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা প্রিমিয়াম আয়ের বিপরীতে ব্যয় দাঁড়ায় ২১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী,মোট প্রিমিয়াম আয়ের ১৬১ শতাংশ ব্যয় হয়েছে বেতন-ভাতা খাতে এবং আরও ১৪১ শতাংশ ব্যয় হয়েছে প্রশাসনিক কাজে।
আর্থিক প্রতিবেদনে তথ্যের গড়মিল,শান্তা লাইফের আর্থিক প্রতিবেদনে একই সময়ের ব্যয় নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে।
চতুর্থ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের ব্যবস্থাপনা ব্যয় দেখানো হয়েছে ১৬ কোটি ২২ লাখ টাকা। তবে ৩১ ডিসেম্বরের প্রতিবেদনে একই ব্যয় ১৩ কোটি ৯৮ লাখ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে নিরীক্ষিত বার্ষিক প্রতিবেদনে ব্যবস্থাপনা ব্যয় দেখানো হয়েছে ১৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
একই সময়ের জন্য তিন ধরনের প্রতিবেদনে তিন ধরনের তথ্য থাকায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
কমিশন ব্যয়ে নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ
বীমা খাতের বিদ্যমান বিধান অনুযায়ী,নবায়ন প্রিমিয়াম সংগ্রহে এজেন্ট কমিশন সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত দেওয়া যায়। কিন্তু শান্তা লাইফ ২০২৫ সালে এ খাতে ১৪ দশমিক ৫২ শতাংশ কমিশন দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী,২ লাখ ১০ হাজার টাকা নবায়ন প্রিমিয়াম সংগ্রহে ৩০ হাজার টাকা কমিশন ব্যয় করা হয়েছে, যা প্রচলিত বিধিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
লাইফ ফান্ডে বড় ঘাটতি
লাইফ বীমা কোম্পানির গ্রাহক দাবি পরিশোধের প্রধান ভিত্তি হলো লাইফ ফান্ড। কিন্তু অতিরিক্ত পরিচালন ব্যয়ের কারণে শান্তা লাইফ পর্যাপ্ত তহবিল গঠন করতে পারেনি।
২০২৪ সালে কোম্পানিটির লাইফ ফান্ডে ঘাটতি ছিল ৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে ২০২৫ সালে মাইনাস ১৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকায় পৌঁছেছে।
এর পাশাপাশি ১৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা ঋণ গ্রহণ করায় কোম্পানির আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা
২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রধান কার্যালয়ের বাইরে শান্তা লাইফের দুটি শাখা অফিস রয়েছে। সেখানে ৬১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত আছেন।
এ ছাড়া মাঠপর্যায়ে ৩২৪ জন কর্মী রয়েছেন। এর মধ্যে ২৫৯ জন ফিল্ড অ্যাসোসিয়েট (এফএ),৬৫ জন ব্রাঞ্চ ম্যানেজার (বিএম) এবং বিএমদের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে আরও ৩৮ জন কর্মরত রয়েছেন।
কোম্পানির ব্যাখ্যা
শান্তা লাইফের চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার (সিএফও) ও কোম্পানি সেক্রেটারি মাজেদুর রশীদ চৌধুরী বলেন, নতুন লাইফ বীমা কোম্পানির প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যবসার পরিধি সীমিত থাকায় পরিচালন ব্যয় তুলনামূলক বেশি হওয়া স্বাভাবিক।
তার দাবি,দক্ষ জনবল নিয়োগ এবং একটি মানসম্মত প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে প্রাথমিক বিনিয়োগ বেশি হচ্ছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে ব্যয় অনুমোদিত সীমার মধ্যে চলে আসবে এবং ২০২৭ সালের মধ্যে কোম্পানির লাইফ ফান্ড ইতিবাচক অবস্থানে যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তবে নবায়ন প্রিমিয়ামে ১৪ দশমিক ৫২ শতাংশ কমিশন প্রদানের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।